বাংলা সায়েন্স ফিকশন মহাকাশযোদ্ধা

প্রোটনের অভ্যর্থনা

(এই মিউজিক সহ পড়লে আরো ভালো লাগার কথা)

প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছে বাইরে। রিশানের জীবনে এমন ঝড় খুব কমই এসেছে। শেষ এসেছিল সেক্টর ৭ এর ভূমধ্যসাগরীয় যুদ্ধের শেষ পর্বে। তখন সে ছিল মামুলি একজন ফুট সোলজার। দুচোখ ভর্তি হোম প্ল্যানেট ফোবিয়ানের স্মৃতি আর বুক ভরা আবেগ রেবেল আর্মির প্রতি। তারপর অবশ্য বহুবছর পার হয়ে গেছে। রিশান একজন মহাকাশযোদ্ধা, তার পদের নাম সাবকমান্ডার। রিশানের অধীনে ২৫ জনের একটা টিম কাজ করে। দেখতে লম্বা চওড়া আর মিক্সড মার্শাল আর্ট রিংয়ে নিয়মিত সময় কাটানোয় একটা বলিষ্ঠ ভাব বিদ্যমান তার শরীরে। চেহারায় পোড়খাওয়া ভাব আর দুচোখ ভরা অভিজ্ঞতার চাহনী দেখে যে কেউ তাকে কমান্ডার হিসেবেও ভুল করতে পারে। 

 

ঝড়ের কারণে বাইরে প্রোটন গ্রহের চেহারা দেখে ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। ধুলিধূসরিত দমকা হাওয়া বয়ে চলেছে অনবরত। রিশান অনেকক্ষণ তবু সেই অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে রইল। আজ ১৩ বছর ধরে সে যুদ্ধ করে চলেছে। এক কৃষক সন্তান হিসেবে এন্ড্রোমিডা-৫ এর মত শীপে সাব কমান্ডার হওয়া ছোটখাট ব্যাপার না। রেবেল আর্মির প্রতি তার কৃতজ্ঞতা বা আনুগত্যের কোন অভাব নেই, তবে এই যুদ্ধের অসহনীয় নির্মমতা মাঝে মাঝে তাকে কাবু করে ফেলে। কবে শেষ হবে জীবনের এই পর্ব? রিশান কি কখনো দেখে যেতে পারবে এই যুদ্ধের শেষ? নাকি এমন কোন অচেনা, অপরিচিত গ্রহেই হবে তার শেষ সমাধি?

 

আর ভাবতে ভালো লাগছে না। কিছু খাওয়া দরকার। শীতল ক্যাপসুল থেকে তার স্কোয়াড জেগে উঠেছে একঘন্টা হোল। তাদের আসতে আসতে আরেকটু সময় লাগবে। ক্যান্টিনের দিকে হাঁটা শুরু করল রিশান। ব্যুলেটিন অন করল। তার স্যুটের হেলমেটের ভিতরেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ভিডিও। অত্যন্ত সুন্দরী একজন লালচুলের মেয়ে নিউজ পড়ছে খুব যত্ন করে।

‘এন্ড্রোমিডা-৫ এর সকল ক্রু ও সোলজারদের শুভেচ্ছা। ‘বিজয়ের যুদ্ধ’ গত শনিবার ১৫ জুলাই, ২৫৫০ সালে ১৫০ বছরে পা দিয়েছে। এইদিন রেবেল আর্মির সুপ্রীম কমান্ডার মি. এক্স তার বাসভবন থেকে… ‘ রিশান চ্যানেল চেঞ্জ করে মিশন ব্রিফ স্টার্ট করলো। ল্যান্ড করার পর একবার দেখেছে। তাও আবার দেখা দরকার। মেয়েটার বদলে একজন পুরনো রেবেল জেনারেলের অ্যাভাটার সেট করে দিলো, সিরিয়াসনেস বাড়ানোর জন্যে।

 

‘প্রোটন গ্রহে এন্ড্রোমিডা-৫ এর সাব কমান্ডার রিশান, স্বাগতম তোমাকে। আজকের মিশনটি এই যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে। শুধু মাত্র শিপ ক্যাপ্টেন, কমান্ডার এবং সাব কমান্ডারদের জানানো হচ্ছে যে, এই মিশনটিকে ৫ স্টার র‍্যাঙ্ক দেয়া হয়েছে। মিশনের প্রাইমারী অব্জেক্টিভ হচ্ছে…’

ভিডিও অফ করে শুধু অডিও শুনতে লাগলো রিশান। তার ব্রেকফাস্ট চলে এসেছে। দুটো ডিম পোচ, এক গ্লাস দুধ, একটা বড়সড় চিকেন ক্লাব স্যান্ডউচ, এক্সট্রা সস আর মেয়ো দেওয়া, সাথে আপেলের জুস। নিশ্চয়ই লাস্ট স্টপে ট্রপিক্যাল কোন আইল্যান্ড থেকে খাবার নেয়া হয়েছে। পাশের টেবিলে রিক বসে আছে মাথা হেঁট করে। রিশান আপেলের জুসে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল আরামে। আহ, কতদিন ধরে এমন খাবার খাওয়া হয়না! এতদিন শুধু ক্যাপসুল আর বিভিন্ন ধরনের শেক খাওয়া লাগছিল।

 

আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো রিশান। তেমন কেউ নিই, পাশের টেবিলে রিক ছাড়া। খাবার সার্ভ করছে একটা লেভেল-২ সার্ভিস রোবট। নির্দেশ দিলো রিকের টেবিলে বাকি খাবার গুলো নেবার জন্যে, আর গিয়ে বসলো রিকের মুখোমুখি।

রিশান। রিক, কি হলো? এখনো আপসেট?

রিক মাথা তুলে দেখলো রিশানকে। হাল্কা একটা হাসি দিলো, খুব কষ্টে মাখা।

রিশান। আহ হা। এমন করলে হবে?

রিক। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না রিশান। শোভা এভাবে শিপ স্যুইচ করলো? আমি এমন কি অন্যায় করেছিলাম?

রিশান। (৫ স্টার মিশনে এমন ছ্যাঁক খাওয়া প্রেমিককে আনার জন্যে রিক্রুটারদের  মনে মনে একটা গালি দিলো) হয়তো ওর কোন দোষ ছিলো। নিজেকে কেন কষ্ট দিচ্ছিস?

রিক। আমি জানি না রিশান। আমি কিছুই জানি না।

রিশান। শোন রিক, আমরা সোলজার। এসব ব্যাপারে এত মাথা ঘামালে হবে না। কাল যদি আমার একটা ভুলের জন্যে একটা বুলেটে তোর জীবনটা চলে যায়, তাহলে কি হবে বল?

রিক। কি হবে তাহলে? কি হবে রিশান? সেটাই কি ভালো না? ১২ বছর ধরে আমরা যুদ্ধ করে যাচ্ছি, এর শেষ কোথায়? ১৫০ বছর হয়ে গেছে! মি. এক্সের তিন নাম্বার ক্লোন এখন যুদ্ধ চালাচ্ছে! মারা যাওয়াই তো ভালো তাই না?

 

রিশান একটু আটকে গেল। এগুলো যে তারও মনের কথা। এবার শীতল ক্যাপসুলের ঘুমটা তার একদমই ভালো হয়নি। পুরোটা সময় দুঃস্বপ্ন দেখেছে। একটু ভেবে নিয়ে সে আবার কথা শুরু করল।

রিশান। দেখ রিক, রিপাবলিকানদের রাজত্ব শেষ না করলে এই মহাবিশ্বে শান্তি আসবে না। লোভ আর লালসার কারণে ওদের মধ্যে আর কোন মনুষ্যত্ব নেই। আজকে শোভা তোকে ছেড়ে চলে গেছে দেখে তোর এত মন খারাপ, কিন্তু রেবেল আর্মি না থাকলে তুই আমি শোভা কেউ তো বেঁচেই থাকতাম না। শোভা শিপ স্যুইচ করেছে ঠিক আছে, কিন্তু তোদের যে আবার দেখা হবে না তার কি ঠিক আছে?

রিক। খুব বললি, তাই না? তোর সাথে সেই হার্ভেস্টার বড়লোক মেয়েটার আর দেখা হয়েছে? কি যেন নাম ছিলো ওর?

রিশান আবার থমকে গেলো। মেজাজটা খারাপ হচ্ছে এখন। ডিমটা মুখে পুরে দিল একবারে। কিছু বললো না।

রিক। মাইন্ড করলি? মাইন্ড করিস না। আমার ওপর সবাই মাইন্ড করে। আমার ঠোঁট কাটা স্বভাবের জন্যেই শোভাও চলে গেল।

রিশান। সেজন্যে যায় নি। শোভা গেছে কারণ তুই অবসেসিভ এবং পজেসিভ হয়ে পড়েছিলি। ২৫৫০ সাল এটা রিক। মেয়েরা এসব পছন্দ করে না। They need to have their freedom.

রিক। তো আমাকে বললো না কেন?

রিশান। চেষ্টা কি করেনাই? আমাকে একদিন জানালো ব্যাপারটা। তারপর আমি তোকে বোঝাতে গেলাম আর তুই সাথে সাথে চেতে গেলি ওর ওপর। কেন তৃতীয় আরেকজনকে ডেকে আনছে সম্পর্কের মধ্যে?

রিক। আমি তো আর তখন জানতাম না অবস্থা এত খারাপ!

রিশান। দেখ রিক, এমন চমৎকার একটা ব্রেকফাস্ট গত ৩ বছরে পাইনাই। এত আফসোস করে এটাকে নষ্ট করবি কেন? Enjoy the present, bro.

রিক। I know. আসলে কয়েকটা দিন সময় দে আমাকে।

 

রিশানের খাওয়া শেষ। ট্রেটা বিনে ফেলে বের হয়ে আসলো সে। রিকের ব্যাপারে রিপোর্ট করা কি ঠিক হবে? মানসিকভাবে ঠিক আছে বলে মনে হচ্ছে না ওকে। পিছন ফিরে তাকালো একবার। রিককে এখন একটু উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। কি মনে করে রিশান আর রিপোর্ট করলো না। সরাসরি লিফট দিয়ে নিচে নামলো। মেইন হলওয়েতে রিসিপশনিস্ট ইলেন তাকে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে হ্যালো বলল। রিশানও হাসি দিয়ে উত্তর দিলো। স্পেশশিপে রিসিপশনিস্ট কেন রাখা হয় সেটা রিশান এখনো বোঝেনি। তবে এই মেয়ে শুধু রিসিপশনিস্ট না, এবং ডেঞ্জারাস। মিক্সড মার্শাল আর্ট রিংয়ে রিশানকেও একবার ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল প্রায়। প্রায়। শেষমেষ ট্রায়াংগল চোক দিয়ে বেটিকে শান্ত করতে হয়েছে। রিশান ইভ্যাক হলের দিকে যেতে যেতে স্কোয়াড ম্যানেজার রনকে কল করলো। রন হেভি মেটাল মিউজিক ছেড়ে শাওয়ারে ঢুকে ছিল। তবে কল রিসিভ করতে তার কোন সমস্যাই হল না কারণ পুরো টিমের সবার কানেই কম্যুনিকেটর ইমপ্ল্যান্ট করা। ধরেই শুরু হয়ে গেল সে,

ইয়েস বস, আলফা টিমের সাথে কথা হয়েছে। ওরা তৈরি হচ্ছে রেকির জন্যে। ৫ মিনিটের মধ্যে ইভ্যাক ডোর -২ এর সামনে আসছি। ওকে বস।

যেন জানতো ঠিক কি কারণে ওকে ডাকা হয়েছে।

 

রিশান মুচকি হাসল কলটা কেটে। এই ছেলেটাকে ওর এইজন্যই পছন্দ। সবসময় চিন্তা করে রাখে আগে থেকে। অলওয়েজ রেডি। আল্ফা, ব্রাভো, ট্যাঙ্গো, চার্লি, ডেল্টা এই পাঁচটা স্কোয়াডকে একসাথে লিড করা খুব সহজ হয় শুধু এই রনের জন্যে। বাইরে সারা আকাশ নীল করে বজ্রপাত হল। ইভ্যাক হলের আয়নার ওপাশে কিছুক্ষণের জন্যে আলোকিত হয়ে উঠল প্রোটন গ্রহের সমস্ত আকাশ। তখনই রিশানের চোখে পড়ল সন্দেহজনক কিছু। চোখ সরু হয়ে উঠল ওর। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিল। ইমার্জেন্সি কল করল ব্রাভো স্কোয়াডের আসাদকে। একটার মধ্যে দুটো টিম নিতে হবে। ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না তার। আসাদ কনফার্ম করল। তার ইটিএ (এক্সপেক্টেড টাইম অব অ্যারাইভাল) ৪ মিনিট।

 

গোপন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে এই প্রোটন গ্রহে আছে রিপাবলিকান আর্মির সিক্রেট বেস। সেখানে আছে তাদের আর্মির বিশাল ডেটাবেজ, বিভিন্ন গ্রহে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বেইজের লোকেশন সহ। সেই দফারফা করতেই এন্ডির (এন্ড্রোমিডা-৫ এর ডাকনাম) এখানে আসা। গতকাল রাতে ল্যান্ড করেছে আনুবিস-৩। কিন্তু এই ঝড়ের কারণে তাদের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ল্যান্ডিং সেইফ হয়েছে কিনা তাও জানা নেই। ১৫০ বছরব্যাপী চলে আসা রিপাবলিকান ও রেবেলদের মাঝের যুদ্ধে এই দুটি শিপের নাম কিন্তু এই শিপদুটির বাইরে ১৫০ জন মানুষও শুনে নাই। ট্যাকটিকাল মিশন ছাড়া এদের কখনোই ব্যবহার করা হয় না। খুবই লাইটওয়েট শীপ, ১২০ জনের মত মানুষ উঠতে পারে। সাধারণত ৬০ জন থাকে, মিশনের গুরুত্ব বুঝে সংখ্যাটা বেড়ে যায়।

 

আসাদের সাথে কথা হবার পর এক মিনিটও গেল না, হঠাৎ কল আসলো রিশানের। ক্যাপ্টেন ক্লার্ক। এই মোটা হাতিটাকে একদম পছন্দ নয় রিশানের। মোটা মানুষের প্রতি কোন রাগ নেই রিশানের। কিন্তু এই লোকটার অলসতা আর কাপুরুষতার কারণে তাকে সহ্য করতে পারেনা। কলটা রিসিভ করলো রিশান। ক্লার্কের চেহারা রিশানের আর্মার্ড স্যুটের মনিটরে বকেই চলেছে,

রিশান! আবারো তুমি এমন শুরু করলা! শিপ ল্যান্ড করেছে আধঘণ্টাও হয় নি। আলফা ব্রাভো টিম শীতল ক্যাপসুল থেকে বের হয়েছে মাত্র একঘণ্টা আগে। মেডিক্যাল প্রটোকলে ওদের আরো একঘন্টা রেস্ট দরকার, বডি ওয়ার্ম আপ করতে হবে। ০.৫g লেভেলের গ্রহে এই প্রথম আসলো ওরা, আর এখনই তুমি তোমার আডভেঞ্চার শুরু করলা! সবসময় তোমার এইসব এটেনশন সিকিং বিহেভিয়ার ভালো লাগে না রিশান!

রিশানের উত্তর সবসময় একই থাকে এসব পরিবেশে।

I fear the ship’s safety is at stake captain. জাহাজ সুরক্ষিত না। রেকি করতেই হবে।

ফাটা বেলুনের মত চুপসে যায় ক্লার্ক, প্রতিবারের মতই। যেন চাবির দম কমে যেতে থাকা খেলনা বানর।

ক্লার্ক। ওহ রিশান। দেখো তাহলে, কি করা যায়। বুঝোই তো,আমি নিয়ন্ত্রণে নেবার পর গত ১৫ বছরে শিপের টোটাল ড্যামেজ মাত্র ৫%। ক্যাজুয়ালটি মাত্র ২১ জন। আর ২ বছর হলেই আমি রেকর্ড বুকে উঠবো। এসময় রিস্ক নেয়া কি ঠিক? মাত্র ২ বছর বাকি! দেখো তাহলে, আমার –

কলটা কেটে দেয় রিশান। যা শালা, এখন বসে বসে পুরান ওয়ার মুভি দেখিস আর ইচ্ছেমতো পাদিস। টিমের কাউকে নিয়ে একফোঁটা চিন্তা নাই, আছে খালি রেকর্ডবুকের চিন্তা। এই ২১ টা ক্যাজুয়ালটির কয়টাতে তুই ফিল্ডে ছিলি ওদের সাথে?

ক্লার্ক আবার ফোন দিল।

রিশান। ইয়েস স্যার।

ক্লার্ক। কলটা কাটলে কেন রিশান?

রিশান। স্যার, আপনার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। মনে হয় আপনি মিউট মোড অন করে রেখেছিলেন।

ক্লার্ক। তামাশা করবে না রিশান। I am your superior officer. আমার কথা তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক, শুনতে হবে। যতক্ষণ আমি বলা শেষ না করি।

চাবির দম বেড়েছে বানরের।

রিশান। স্যরি স্যার।

ক্লার্ক। ইটস ওকে। আর কিছু বলার নেই আপাতত। আমি চোখ রাখছি মিশন ক্যামেরায়। অল দ্য বেস্ট রিশান!

রিশান। থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।

ক্লার্ক। ডিসমিসড।

 

মেজাজটা নিজের ওপরই খারাপ হল রিশানের। মাঝে মাঝে ইদানীং এত রাগ উঠে যায়! সে স্রেফ একটা সাব কমান্ডার। ১৪ বছর আগে মামুলি এক কৃষকের ছেলে ছিল সে। নিজের শিকড় এভাবে ভুলে গেলে চলবে না। আরো ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিৎ তার। এই রেকি মিশনটার ঠিক আগেভাগে ব্রেকফাস্ট করাটাও উচিৎ হয়নি। রিককে বলা নিজের কথাটা নিজের মাথায়ই বেজে উঠলো, স্রেফ একটা ভুল হলেই মৃত্যু অনিবার্য। শুধু নিজের না, এন্ডির,

 

স্পেসসুটের পেছন থেকে এটমিক ব্লাস্টারটা বের করতে করতে রিশান আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। ঝড় হোক আর যাই হোক, আশেপাশের জায়গাটা রেকি করে দেখতে হবে। স্পেসশিপটাকে ইমার্জেন্সী ল্যান্ডিং করাতে হয়েছে। এই গ্রহেরই কোন এক প্রান্তে লুকিয়ে আছে রিপাবলিক আর্মির ৩০০ সদস্য। শুধু একবার জানতে পারলেই হয়, তারা একসেকেন্ড ও দেরি করবে না রিশানদের স্পেসশীপ এন্ড্রোমিডা -৫ কে এটোমিক ডিসইন্টেগ্রেটর দিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে। অতএব সতর্ক থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইভ্যাক ডোরের সামনে চলে এসেছে সে।

 

রন আর আসাদ এসে গেছে তাদের টিম নিয়ে। আলফা ব্রাভো ইন পজিশন। রিশান ইলেনকে সংকেত দেয় ইভ্যাক ডোর -২ খোলার জন্যে। ইলেন বাটন প্রেস করে, মাইকে জানিয়ে দেয় রেকি মিশনের কথা। এন্ট্রি করে রাখে মিশনের ডিটেইলস। তারপর হাত তুলে রিশানকে স্যালুট ঠুকে একটা। রিশান ইলেনকে ফিরতি স্যালুট দেয়।

খুব আলতো স্বরে ইলেন বলে, গুড লাক কমান্ডার।

আরো মৃদু স্বরে, কেউ শুনতে না পায় এভাবে রিশান বলে, ইটস সাবকমান্ডার মাই লেডি। চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘লেটস গো টিম!’

১১ টি মানুষ একে একে বের হয় এন্ড্রোমিডা-৫ থেকে।

 

আরো একবার রিশান তার টিমের সাথে বের হলো। আরো একবার তার বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, শরীরের এড্রেনালিনের খেলা চলছে তুমুল বেগে। মাথাটা একদম পরিষ্কার, চোখ সতর্ক। বিশাল দায়িত্ব তাদের সবার ঘাড়ে। এই একটি মিশন সফল হলেই ঠিক হয়ে যাবে অনেক কিছু। রেবেল ফোর্সের হাতে অনেক অনেক সুযোগ চলে আসবে। বয়েজরা জানে না, কিন্তু মিশন ফোর্সের র‍্যাঙ্কিংয়ে এটা ৫ স্টার মিশন। ১২০ জন ভর্তি করেই এসেছে এন্ডি এই প্রোটন গ্রহে। রিশানের কেমন যেন লাগছে। আর কতবার এমন করতে হবে? প্রতিবারই মনে হয়, এই শেষ। এইবার একটা বুলেট আমাকে ফুটো করে দেবে, আমার আত্মাকে দেবে বের হয়ে যেতে। এইবার বুঝি আমি শান্তিতে চোখ মেলব। কারণ মানুষের সাথে মানুষের এই খুনোখুনি কি কখনো শেষ হবার? মনে হয় না রিশানের। তবে সে কিই বা জানে? স্রেফ একটা স্পেস ওয়ারিয়র। গ্লোরিফায়েড ওয়ার হিরো হবে একদিন হয়তো, মেডেল অব অনার পাবে মিঃ এক্স এর হাতে। ট্রিনিটি দ্বীপপুঞ্জে একটা বিলাসবহুল বাড়ি। But in the end he is nothing but a pawn in the hand of the masters.   

 

Very well then, I will be the biggest, baddest pawn you have ever seen.

রিশানের লিডে এগিয়ে যেতে থাকে আলফা আর ব্রাভো টিম।

বাইরে ঝড়ের ঝাপটা তখনো কমেনি।

 

বোমা না ক্যামেরা?

এন্ডিকে ল্যান্ড করা হয়েছে একটা খাদের ভিতর। প্রায় ৫০ ফুট গভীর একটা প্রাকৃতিক খাদ যার তলাটা প্রায় মসৃণই বলা চলে। এই দুর্যোগের মধ্যে এমন সুরক্ষিত ল্যান্ডিং পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু এন্ডিকে ঠিক খাদের গা ঘেঁষে ল্যান্ড করাতে পারেনি এন্ডির ভেটেরান পাইলট জিমি। তাই বেশ খানিকটা পথ হেঁটে খাদের খাড়া দেয়ালের পাশে আসতে হচ্ছে আলফা আর ব্রাভো টিমকে। সাথে তাদের সাব কমান্ডার রিশান। বাতাসের বেগ একই আছে। ধুলাবালির ঝড় মাঝে মাঝেই প্রবল বেগে আসছে, আবার দূরে চলে যাচ্ছে। যেন ছোঁয়াছুয়িখেলছে তাদের সাথে।

 

রিশান খাদের চূড়ার দিকে তাকালো। ওখানেই অব্জেক্টটা দেখেছে সে। আন্দাজ করতে চেষ্টা করছে কি ওটা? জিনিসটা হয় একটা সিসিটিভি, যেক্ষেত্রে ভয় পাওয়া উচিৎ এন্ডির সেফটি নিয়ে, অথবা জিনিসটা একটা প্ল্যান্টেড বম্ব, যেক্ষেত্রে ভয় করা উচিৎ রিশানের নিজের সেফটি নিয়ে। এধরনের প্ল্যান্টেড বম্ব ব্যবহার করার জন্যে রিপাবলিকানরা কুখ্যাত। দেখা যাক, নাইটভিশন ভিউতে কিছু দেখা যায় কিনা ভাবতে ভাবতেই নাইটভিউশন ভিউ অন হয়ে গেল স্যুটে।

কিন্তু নাইটভিশনে, জুম করে দেখেও বিশেষ কিছু দেখা গেল না। কারণ হিট জেনারেট করছে না অব্জেক্টটা। কি হতে পারে তাহলে? ডেভিলস বম্বও না হবে না, কারণ তাহলে কিছুটা হিট থাকতোই। ডেভিলস বম্ব হচ্ছে আগেকার দিনের মাইনের নতুন সংস্করণ। আশেপাশে কোন কিছু নড়ে চড়ে উঠলেই বুম! এর সিপিইউগুলো এমনভাবে বানানো যাতে বোমা বিস্ফোরিতে হলেও সিপিউ নষ্ট হয় না। আবার নতুন বোমা লোড করে বসে থাকে, নতুন কোন আনফরচুনেট বেক্কলের আশায়।

 

রিশান আনফরচুনেট হতে পারে, তবে বেক্কল না। আর এই বম্বটা কি বম্ব না অন্য কিছু সেটা সে কেন বুঝতে পারছে না তাই ভেবে তার মাথাটা গরম হচ্ছে। যদি এটা বম্ব না হয়ে সিসিটিভি হয় তাহলে কি করা উচিৎ? রিশানের চিন্তা থামলো ফিজের হাত তোলায়, পারমিশিন টু স্পিক, স্যার!

গো এহেড।

স্যার, আপনি ইলেনকে কবে বিয়ে করছেন?

হো হো করে হেসে উঠলো সবাই। তবে স্যুটের কারণে কোন শব্দই বাইরে পৌঁছল না। যে যার হিয়ারিং ইমপ্ল্যান্টে স্পষ্ট শুনছে।

ফিজ ছেলেটা ব্যাপক ফিচেল। সারাক্ষণ অন্যের পিছে লেগে থাকে। আর এত্ত এনার্জি, যেন সব সময় সফট ড্রিংকের বোতল খোলার পর বুদবুদ সহ ফেনা বের হচ্ছে। ফার্নান্দোস্কি নামটাকে পাত্তা না দিয়ে তার নাম তাই ফিজ।

মার্ক। আরে ধুর, বস ইলেনকে আস্ক আউট করার সাথে সাথেই মিদোরা ওর ভুঁড়ি গেলে দেবে। শী হ্যাজ এ ম্যাসিভ ক্রাশ অন হিম।

ফিজ। ওহ হ্যাঁ! বস, তাহলে কি মিদোরাই হবে আপনার বল এন্ড চেইন? আপনার পেইন এন্ড গেইন? দ্য মিশন টু ইওর রিশান?

রিশান নিজেও হেসে ফেলল। এই গম্ভীর মুহূর্তে এসব করা একদম ঠিক না। কিন্তু তার টিমটার সবাই তারছিঁড়া। এদের ব্যাকগ্রাউন্ড হিস্ট্রি শুনলে গোরিয়ানের সবচাইতে নিষ্ঠুর লইয়ারদের পর্যন্ত চোখে পানি চলে আসবে। স্রষ্টা যেন সমস্ত পৃথিবীর সবচাইতে কষ্টকর শৈশব অথবা কৈশোর এঁকে দিয়েছেন এদের জীবনে। কিন্তু এখন সময় এমন যে তা নিয়ে বুকভরা অভিমান বা হতাশা, কোনটারই সময় নেই এখন। তাই তাদের সব মিশনেই এইসব হাসি ঠাট্ট তামাশা লেগে থাকে। এমনকি, অনেক মিশনের নাম এন্ট্রি দেয়া হয় স্রেফ ফিজ বা রবার্টের জোকের  নামে।

রিশান। শোন, আমাকে বিয়ের খাঁচায় পুরতে পারবে এমন রিংমাস্টার এখনো আসেনি।

ফিজ। ওয়াও বস তাই নাকি? আপনার কি হান্টারওয়ালী দরকার? মিদোরা কিন্তু খুব ভালো পারে কাজটা। সেবার নিউ ইয়ার্স ইভের পার্টীতে কি হইসিলো জানেন না? ট্যাংগো টিমের অ্যান্টন লাইন মারতে গেসিলো মিদোরার সাথে, লিটারেলি পাছা লাল করে দিসে বার্নার গান দিয়ে।

জ্যাক। আরে নাহ, ওটাকে লাইন মারা বলে না। ও তো গেছিলো ঘষতে। শালা একটা পার্ভার্ট। মিদোরা ঠিকই করসে কাজটা। ওর একটা উচিৎ শিক্ষা দরকার ছিলো। 

রবার্ট। So Anton got his wrong end heated up?

আবার হাসি।

শিবরামও চেষ্টা করে।

Poor Anton couldn’t keep his pants on.

ফিজ। ওয়াও, তুমি কি এইমাত্র একটা জোক বললা শিবু? আমরা কি হাসবো এখন?

শিবুর বিব্রত চেহারা দেখে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। ১৮ বছর বয়সী ছেলেটাকে সবাই খুব পচালেও ভালোবাসে কিন্তু একদম ছোট ভাই হিসেবে। সত্যিকার কথা হলো, এই ১১ জনের দলের সবাই জানে, তাদের কারো কোন আত্নীয়ই এই মহাবিশ্বে বেঁচে নেই। এই ১৫০ বছরের যুদ্ধ সব নিয়ে গেছে তাদের। সব নিয়ে শুধু রেখে গেছে তাদের সার্ভাইবাল ইন্সটিঙ্কট, যেভাবে প্রবল উন্মত্ত ঝড় জঙ্গলেরেখে যায় গাছপালার ধ্বংসাবশেষ। এখন শুধু রেখে গেছে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা, আর শত্রুকে খুন করে ফেলার জন্যে জমানো তীব্র জিঘাংসা।

 

হাসাহাসির করতে করতে খাদের একেবারে নিচে চলে এসেছে ওরা। রিশান এর মধ্যে ঠিক করে ফেলেছে, উপরে উঠেই দেখবে জিনিসটা। সিসিটিভি হবার যেহেতু সুযোগ আছে, তাই একেবারে উঠে পড়বে না। একেবারে কাছাকাছি উঠে, স্যুট ট্রান্সপারেন্ট ক্যামোফ্লেজ করে তারপর উপরে উঠতে হবে। কিন্তু বিপদ হলো, মাত্র ৩০ সেকেন্ড পাওয়া যাবে কাজটা করার জন্যে। গুড ইনাফ। রিশান ওপরে ওঠা শুরু করে দিল। ফলো মি বলার সাথে সাথে বাকিরা আর কথা না বাড়িয়ে উঠতে লাগলো।

চূড়ার কাছে উঠে রিশান ঘড়ি দেখলো। প্রায় ২ মিনিট লেগেছে ওপরে উঠতে। ২৫ ফিট পার মিনিট। নট ব্যাড, ভাবলো রিশান। ঝড়ের জন্যে একটু বেশি টাইম লাগলো। রিশান  তার টিমকে সংকেত দিলো স্ট্যান্ডবাই থাকতে। সবাই কাছাকাছি জায়গায় আছে। এবার একটা লম্বা দম নিয়ে নিজের শরীরটাকে খিঁচিয়ে টান টান করে ফেলল রিশান। এবার আবার সব মাসল রিল্যাক্সড করল। মাথা ঝাঁকালো কয়েকবার। পুরানো অভ্যাস। মনে মনে কল্পনা করতে থাকলো, কাজটা সে কিভাবে করছে। যেন ভিডিও রিপ্লে দেখছে পরবর্তী ৩০ সেকেন্ডের। কিভাবে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে অব্জেক্টটার কাছে যাবে,  সিসিটিভি কিনা কিভাবে নিশ্চিত হবে, যদি সিসিটিভি না হয় তাহলে কি করবে এবং যদি হয়, তাহলে কিভাবে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ক্যামোফ্লেজ চলে যাবার আগেই আবার ফেরত চলে আসবে ঠিক এইখানে।    

 

সমস্যা একটাই। ঝড়। বাতাসের বেগ বাড়ছেই। রিশানের স্যুট থেকে দুটো সাকশান ক্যাপ বের হয়ে তাকে আটকে রেখেছে পাহাড়ের সাথে। নাহলে অনেক আগেই বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেত কোন সুদূরে, আছড়ে ফেলত প্রোটনের অ্যালুমিনিয়াম রিচ শক্ত মাটির ওপর। ব্যাপার না। এখন করো নয়তো মরো অবস্থা। রিশান মনে মনে এক, দুই, তিন গুনে ভিজ্যুয়াল ক্যমোফ্ল্যাজ অন করে সাথে সাথে খাদের চূড়ার কিনার ধরে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। জুতোর গ্র্যাভিটি মোডিফায়ার বাড়িয়ে তোলার কম্যান্ড দেয়, নাহয় বাতাস তাকে সোজা দৌড়তে দেবে না। সিসিটিভি হোক বা বম্ব, বস্তুটার দিকে খিঁচে দৌড় দিতে যাবে, তখনই যেন ভূমিকম্প হল। মুহূর্তের মধ্যে রিশান টের পেল, তার পায়ের নিচে মাটি গায়েব। পড়ে যাচ্ছে সে তার অত্যন্ত ভারি, গ্র্যাভিটি মোডিফায়ার অন করা স্যুট সহ। 

 

খাদের চূড়াটা আসলে শক্ত মাটির ছিলো না। রিশানের ওজন নিতে পারেনি। তাই তার আশাপাশের বেশ একটা অংশজুড়ে থাকা বড় মাটির ঢেলা ভেঙ্গে পড়ল। । ঠিক নিচ বরাবর ছিল ফিজ। সে সাথে সাথে ডান দিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচল ঢেলার সাথে বাড়ি খাওয়া থেকে। রিশান সাথে সাথেই খাদের গা থেকে বের হওয়া একটা পাথর ধরে ঝুলে পড়ল। ক্যামোফ্লেজ আর গ্র্যাভিটি বুট অফ করল আর মনে মনে নিজেকে একশ একটা গালি দিল। সাকশান ক্যাপ দিয়ে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করে উপরে তাকাতেই দেখে একটা উদ্ধত .৭৬ ক্যালিবারের ব্লাস্টারের বিপজ্জনক প্রান্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে। স্কোয়াডের সবাই খেয়াল করেছে ব্যাপারটা। যে যার বন্দুক বের করে খাদের ওপর বুকচেতিয়ে দাঁড়ানো বন্দুকধারীনির দিকে তাক করলো। কেউ কিছু বললো না বেশ কিছুক্ষণ ধরে। কেউ আর এক চুল নড়লোও না বেশ কিছুক্ষণ ধরে। পুরো সময়টা যেন থমকে হয়ে গেছে। চলমান ভিডিওতে কেউ পজ বাটন চাপ দিলে যেমন হয়।  

 

আস্তে আস্তে বন্দুকধারীনি বন্দুকের নল সরালো। ঠিক সেই সময়েই পুরো আকাশ নীল করে আরেকটা বাজ পড়লো। বজ্রপাতের সাথে সাথে তার আওয়াজ শোনা যায় না। কিন্তু রিশানের বুকে সেই বাজের সাথে সাথেই বাজের আওয়াজের চাইতেও সহস্রগুণে তীব্র আওয়াজ বেজে উঠল। এযে রুমিনা! তার কালচে সোনালী চুল উড়ছে বাতাসে, ১৪ বছর আগে ফোবিয়ানের মরুপ্রান্তরের সেই কোমল চেহারার মেয়েটা আজ তার দিকে বন্দুক ধরে তাকিয়ে হাসছে। গায়ে রিশানদের টিমের চাইতে অ্যাডভান্সড আর্মার্ড স্যুট। তবে স্যুটের গায়ে রেবেল মার্কার। আশ্বস্ত হল রিশান। একই সাথে শঙ্কিত হল, রুমিনার সাথে এখন কথা বলতে হবে! কি বলবে সে? রুমিনাই বা কি বলবে? রিশানের স্যুটের হেলমেটের কারণে রুমিনা এখনো তাকে চেনে নি। সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে রিশানকে ওঠার সহায়তা করতে। টিমের বাকিরাও স্বস্তি ফিরে পেয়েছে, একে একে সবাই উঠছে। রিশান খুব কাব্যিক কিছু বলবে, নাকি স্রেফ হাই বলবে, তাই ভাবছে। মাথায় কিছুই খেলছে না। এত চিন্তা করার সময় একজন মহাকাশযোদ্ধার কখনোই থাকে না। যা হোক একটা কিছু বলবো, ভেবে হেলমেট খুলে ফেলল সে।

রুমিনাই প্রথম কথা বললো।

Son of a bitch! রিশান তুমি?

 

আনুবিসের পথে

(এই মিউজিক সহ পড়লে আরো ভালো লাগার কথা)

রিশানের মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। কিচ্ছু খেলছে না মাথায়। আর মেজাজ চড়ে উঠেছে সপ্তমে । তার জীবনে ফেরত আসার আর সময় পেলো না মেয়েটা! সকালবেলায় সদ্য ছ্যাঁকা খাওয়া বন্ধু রিকের কথাটা মাথায় আসলো, “তোর সাথে সেই হার্ভেস্টার বড়লোক মেয়েটার আর দেখা হয়েছে?”

আজ হলো। ১৪ বছর পর। আর ঠান্ডা মাথায় কাজ করা উঠলো মাথায়। কি বিরক্তিকর!

রিশান। কেমন আছ, রুমিনা?

রুমিনা। [স্কোয়াডের দিকে তাকিয়ে] তো, এটাই তোমার স্কোয়াড? এন্ডি ল্যান্ড করেছে কোথায়?

রুমিনার কন্ঠে ঝাঁঝ টের পেয়ে  রিশানের ভালো লাগলো না। এত পার্ট মারার কি আছে? ১৪ বছর আগে ফোবিয়ানের সেই ঘটনাটার জন্যে? তাহলে তো রাগ হবার অধিকার রিশানেরও আছে। তবু নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করলো রিশান।

রিশান। প্রায় দুইশ গজ নর্থে। তুমি আনুবিসের কোন পোস্টে আছ?

রুমিনা। এন্ডির কোওর্ডিনেট সেন্ড করো।

রিশান কিছু বলার রুচি হারিয়ে ফেলে।

তাহলে এমন করবে তুমি আমার সাথে। গনা প্লে ইট কোল্ড। ঠিক আছে।

চুপচাপ কোওর্ডিনেট শেয়ার করে রিশান দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

প্রোটনের আকাশে মেঘের পরিমাণ কমে এখন একটু নীলচে আভা ফুটে উঠেছে, আর সেই আভা ভেদ করেই মুহুর্মুহু ভেসে আসছে একের পর এক তীব্র বাতাসের ঝাপ্টা। প্রোটনের রুক্ষ পাথুরে উপত্যকায় বাতাসের এমন বেয়াড়া আনাগোনায় এক অদ্ভুত মায়াময় সুর তৈরি হয়েছে, যা ষোড়শ শতাব্দীর বারোক সংগীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।  স্যুটের কারণে বাতাসের ঝাপটা গায়ে না লাগলেও তা যেন ফালি ফালি করে ফেলছে রিশানের হৃদয়কে, যেন লক্ষ লক্ষ সূক্ষ্ণ সুঁইয়ের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে মনটা। এই সুরের হাহাকারের কারণেই হয়তো ভেতরটা এত অনুভূতিপ্রবণ হয়ে উঠেছে রিশানের। এখন রিশানের কেমন লাগছে, তা বুঝিয়ে বলা কঠিন। এই অনুভূতির চাইতে হয়তো গুলি খেয়ে রক্তের স্রোতে ভেসে মরে যাওয়াটাও আরাম লাগতো। মনের রক্তক্ষরণ তো দেখা যায় না, কেবল যার ভেতরে হয় সেই জানে কেমন লাগে। দেহেরটা দেখা যায়, তাই মনে হয় আহা! কি কষ্ট! অথচ মনের রক্তক্ষরণ প্রতিনিয়ত মৃত্যু ঘটায় সত্তার, প্রতিটা মিনিটেই কেবল অস্তিত্ব হারানোর হাহাকার, আর বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছার যুদ্ধ। কিন্তু, রিশানের তো ধারণা ছিল যে সে কাটিয়ে উঠেছে তার সেই অতীতকে।

এতবছর পরে তো এমন কিছু হবার কথা না।

রুমিনার দিকে আবার তাকালো রিশান। সে ফিজকে কি যেন বলছে, শেষ হতে না হতেই ফিজ হো হো করে হেসে ফেলল। রিশানের মাথা আবার চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিশনের কথা চিন্তা করে। মাথাটা ঠান্ডা করতে হবে। রুমিনা হেলমেট ছাড়া ছিল, কিন্তু তাই দেখে নিজেরটা খুলে ফেলাটাও ঠিক হয় নি রিশানের। চিন্তাভাবনা গুলো তার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? এই মিশনটা এত কুফা লাগছে! আবারো একবার প্রচন্ড শব্দ করে বজ্রপাত হল।

 

সেই বজ্রপাত হঠাৎ করে রিশানকে নিয়ে গেল অন্য কোথাও।

 

প্রোটনের রুক্ষ পাথুরে উপত্যকা ছাপিয়ে, সুবিশাল পাহাড়ের চেয়েও বড় হয়ে রুমিনার চেহারাটা ভেসে উঠল রিশানের চোখে। ১৪ বছর আগের ষোড়শী একটি মেয়ে। ফোবিয়ানের সুপ্রশস্ত মরুভূমি, তার মাঝে একফালি ছোট্ট সবুজ মরুদ্যান। সেদিনও এমন অবাধ্য বাতাস, মরুভূমির রাতের নীল আকাশের চোখের সামনে, রুমিনার ঘন কালো চুল বারবার এলোমেলো করে দিচ্ছে। শেষরাতের আকাশে নিভতে থাকা, রাতের মরুভূমির তীব্র শীতে কাঁপতে থাকা নীল তারারা, আর দূরে খুব আস্তে আস্তে হাজির হতে থাকা রক্তমাখা সূর্যোদয়ের চাদরের নিচে একজোড়া নীল চোখ তাকিয়ে আছে রিশানের দিকে। হাসছে, কাঁপছে, বিস্ময় মেখে আরো বড় হচ্ছে আকারে। এগিয়ে আসছে তার দিকে, খুব ধীর গতিতে। এত ভালো লাগাও কি সম্ভব এই বর্বর পৃথিবীতে?

এই যে স্যার!

সম্বিৎ ফিরে পায় রিশান।

সবাই হাসছে। ফিজ চোখ সরু করে তাকাচ্ছে তার দিকে। রন কিছুটা বিরক্ত। তার বস রিশানকে নিয়ে কেউ মজা করলে তার ভালো লাগেনা। মানুষটা অনেক ঠান্ডা ধাঁচের, মুখ বন্ধ রেখে অনেক কষ্ট সহ্য করতে দেখেছে তাকে। বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখেছে। গত বছরই ডোমিস গ্রহের রাজকন্যার সাথে বিয়ে করার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে আবার এই যুদ্ধ লড়তে ফিরে এসেছে লোকটা। কারণ সে তার আদর্শে অটল। অবশ্য একথা সে নিজে বলেনি রনকে। দলপতির অন্ধভক্ত মানুষগুলোর মত, রনই কল্পনা করে নিয়েছে। । এই লোকটার কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু, সবসময় তার এটাই মনে হয়।

রুমিনা সবাইকে ইশারা করে ওর পিছু নিতে। আনুবিস নাকি কাছেই ল্যান্ড করা। রুমিনার ব্যাজে চোখ চলে যায় রিশানের। একটা সোনালী ঈগল ডানা মেলে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। ভাইস ক্যাপ্টেন! রুমিনা তাহলে আনুবিসের  ভাইস ক্যাপ্টেন! অবশ্য, রিশানের চাইতে তার ক্যারিয়ারও আগে শুরু হয়েছে, আর তার পরিবারও যথেষ্ট ক্ষমতাশালী ছিল। আর কথা না বাড়িয়ে রিশান রুমিনাকে ফলো করে, চেষ্টা করে ঘোর থেকে বের হতে। এই মেয়েটার মধ্যে এমন কিইবা আছে? তার মত একটা কাঠখোট্টা মহাকাশযোদ্ধাকে এত স্মৃতিকাতর করে ফেললো?

না না না! এখন এসব একদম চিন্তা করা যাবে না। ঠিক আছে? এখন মিশনে আছে সে। যেকোন মুহূর্তেই যেকোন কিছু হতে পারে। এটা ফাইভ স্টার মিশন। ঝুঁকি নেয়া চলবে না একদম। ফাইভ স্টার মিশন জিততে পারা মানে রেবেলদের যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে তোলা। হেলমেটটা পড়তে পড়তে রিশান মনে মনে নিজের ভাগ্যকে একশ একটা গালি দিল। এই যুদ্ধে এত শত শত মিশন থাকতে তার এই মিশনেই রুমিনার কেন আসতে হল?

যেহেতু রুমিনা সবার আগে আগে যাচ্ছে, রিশান আস্তে আস্তে সবার শেষে চলে আসলো। কেন যেন হাতের ব্লাস্টারটা এখনো অফ করে নি সে। একটু সেদিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে হলো মাটি কেঁপে উঠেছে। আবার? রিশান নড়াচড়া করবার আগেই তার পায়ের নিচে বিশাল একটা গর্ত তৈরি হল যার ভেতর রিশান আর তার সামনে থাকা মার্ক দুজনেই পড়ে গেল!

রিশান আশেপাশে হাত দিয়ে কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলো, কিন্তু এবারে আর লাভ হলো না। বেশ জোরেই মাটিতে গিয়ে পড়ল সে, তার পাশেই আছড়ে পড়ল মার্ক।

সান অব এ বিচ!

রিশান মার্কের চীৎকার শুনেই বুঝল, খুব খারাপ ভাবে ব্যথা পেয়েছে সে। সে নিজেও প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছে পিঠে। চোখ অন্ধকার হয়ে গেছে, স্পেসস্যুটের ইমার্জেন্সী লাইট জ্বলে উঠেছে তাও কিছু দেখতে পারছে না ব্যথার জন্যে। মার্ক কাতরে চলেছে। রিশান চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিলো। রুমিনা চীৎকার করে ডাকছে, রিশান, আর ইউ গাইজ অলরাইট? রিশান কিছু বলতে গেল কিন্তু কোন শব্দ বের হল না। আরো কিছুক্ষণ দম নিলো, চোখ খুলল। হ্যাঁ, এখন দেখা যাচ্ছে।

স্পেসস্যুটের স্ট্যাটাস দেখে নিল সে, ৯৬% ওকে, মাইনর কিছু ড্যামেজ। শরীরের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। উঠতে গিয়ে তবুও খুব ব্যথা লাগল। মাথাটা কেমন শুন্য শুন্য আর হালকা লাগছে, যেন একটা বাতাসে ভরা ফুটবল। মাইকে রুমিনার ডাক, কি হয়েছে রিশান?

রিশান কথা না বলে আগে মার্কের দিকে ঘুরল।

ভেতরটা বেশ অন্ধকার। রিশান তার হেলমেটের লাইটের কারণে সামনেরপ্রায় দুই ফুটের মত এলাকা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। মার্ক তার কাছেই আছড়ে পড়েছে, ডান দিকে। ঘুরে তার দিকে তাকিয়ে রিশানের বুকটা ধ্বক করে উঠল।

মার্ক পড়েছে একগাদা খাড়া হয়ে থাকা সরু, ধারালো, শুঁড়ের মতো বের হয়ে থাকা পাথরের ওপর। রিশানের মত ভাগ্য ভালো ছিলো না তার, হাতের কনুইয়ের ঠিক ওপরের জায়গা বরাবর একটা ধারালো পাথর এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে বের গেছে। স্পেসস্যুট কয়েক জায়গায় ভেঙ্গে গেছে, শরীরের অসংখ্য জায়গায় খাটো-লম্বা ধারালো পাথর ঢুকে গেছে। মার্কের সমস্ত শরীর আর তার নিচের পাথুরে মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মার্ক কাতরাতে কাতরাতে কিছু একটা বললো, কিন্তু মানে বোঝা গেলো না। কেবল অস্ফুট গোঙ্গানী।

 

স্যুটের মাইক কাজ করছে না দেখে রিশান মার্কের আরো কাছে গেল কথা বোঝার জন্যে। মার্ক সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে বললো,  ফিনিশ মি রিশান। আমাকে মেরে ফেলো।

রুমিনা এখন চীৎকার করছে, কি হয়েছে রিপোর্ট করো রিশান! এত সময় নিচ্ছো কেন?

ভাই হয়ে ভাইকে আদর করতে হয়, ভালোবাসতে হয়। মার্ক আর রিশান এক সাথে চারটা মিশনে ছিলো। রিকন গ্রহের যুদ্ধে যুদ্ধে ইএমপি পালসে সব গাড়ি বিকল হবার পর মার্ক আর রিকন পুরো ২ দিন পাশাপাশি মার্চ করেছে, যুদ্ধ করেছে। মার্কের অতুলনীয় স্নাইপিংয়ে সেদিন রিশানের জীবন বেঁচেছে। সেই ভাই যার সাথে বসে রিশান টোস্ট করেছে ব্যটল জয়ের আনন্দে। মাতাল হয়ে মার্কের গলা জড়িয়ে চীৎকার করে বলেছিল, উই আর ব্লাডব্রাদ্দার্স! আমরা রক্তের ভাই! আজ সেই ভাই শুয়ে আছে রিশানের সামনে। ভিক্ষা করছে নিজের মৃত্যুর জন্যে। ভাই হয়ে ভাইকে কি মৃত্যু ভিক্ষা দেয়া যায়?

আজ মার্ককে যতটা আপন লাগছে, এর আগে কখনো লাগেনি রিশানের। হঠাৎ করেই সে টের পেলো তার স্কোয়াডের সবাই তার কত কাছের। নিজের গ্রহ ছেড়েছে সেই কবে, কিন্তু বাবা মা কে ছেড়ে আসার যে কষ্ট বুকের কোন গহীন কোণে শক্ত মাটির নিচে চাপা দেয়া ছিল, তা যেন মার্কের এক কাতরোক্তি শুনে, তার সাথে একাত্ন হয়ে চিৎকার করে বেরিয়ে এল। মার্ককে বাঁচানো আর সম্ভব না ভেবে এত কষ্ট লাগছে কেন? তার এই অনুভূতির কোন দাম নেই এই যুদ্ধের কাছে। তারা সবাই এক্সপেন্ডেবল, একজন মরলে আরেকজন তার জায়গায় চলে আসবে। রিশান নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কি বোঝাবে?

রুমিনা এখনো চীৎকার করেই যাচ্ছে। রিশানের কানে করুণ কোন ইটালিয়ান অপেরার সুর বাজছে, যেন গ্রীক ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য মঞ্চায়িত হচ্ছে। কি করবে সে এখন?

প্লিজ রিশান, ডু ইট। মার্ক আবার বলল।

রিশান, রিপোর্ট টু মি! আই এম ইউর সুপিরিয়র অফিসার!

রুমিনার কন্ঠস্বর কর্কশ হয়ে উঠছে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরা সবাই আমার সুপিরিয়র। আমিই শুধু ইনফিরিয়র। রিশানের মনের কথা আর কেউ শুনল না তার হৃদয় ছাড়া।

রিশান আরেকবার তাকালো মার্কের দিকে ভালো ভাবে। বিড়বিড় করছে এখন। ছ’ফুট লম্বা শরীরটা যেন রক্ত দিয়ে গোসল করেছে। চোখ দুটো প্রায় বন্ধ, যতটুকু খোলা সম্ভব খুলে রেখে বরাবর রিশানের দিকেই তাকিয়ে আছে।

রিশান ওর ব্লাস্টারটা তুলে ধরল। মাথা ঘুরাচ্ছে ওর।

আমি সামান্য একটা কৃষকের ছেলে। এইসব সিদ্ধান্ত আমার নেয়ার কথা না। আমি…

রিশানের ব্লাস্টারটা গর্জে ওঠে। মার্কের দেহ একবার কেঁপে থেমে যায়। মুখে কি একটু হাসি ফুটল?

একটা সুতীব্র কষ্টের দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল রিশানের অন্তরাত্মা থেকে। এভাবে কতগুলি ভাই তার হাতে বিদায় নিয়েছে শুধু সেই জানে। হয়তো তার বিদায়ও এভাবেই হবে। রিশান রুমিনাকে রিপোর্ট করে।

রুমিনা, মার্কের হাতে সময় ছিলো না বেশি। আই হ্যাড টু ডু ইট।

আই আন্ডারস্ট্যান্ড রিশান। আমরা দড়ি ফেলছি ওপর থেকে। তুমি উঠে আসো।

রিশান আশেপাশে তাকালো দড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে করতে। পুরো জায়গায় মৃত্যুর শীতল এক নৈঃশব্দ এসে জমাট বেঁধেছে। রিশানকেও যেন আটকে ফেলেছে সেই নৈঃশব্দ, যেভাবে মাকড়সার জালে পোকা আটকে পড়ে। রিশানের ছটফট লাগতে থাকে। এই মৃত্যুফাঁদ এভাবে কে পেতে রেখেছিলো? এক মুহূর্তের জন্যে চমকে উঠলো রিশান, এটা কোন ট্র্যাপ নয় তো? স্ক্যান করে দেখলো, কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইস আছে কিনা।

তা নেই, তবে গর্তটার দেয়ালে একটি ফুটো দিয়ে আলো আসছে খুব হাল্কা করে। এটা খাদের দেয়ালেরই একটা অংশ তাহলে। রিশান কাছে গিয়ে জুম করলো বাইরে, সময়টা কাটাতে হবে কিছু করে, খুব ফালতু সব চিন্তা আসছে মাথায়। আচ্ছা, বাইরে কি তিনজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে না? আস্তে আস্তে হেঁটে খাদের দেয়ালের দিকেই আসছে? রিশান সাথে সাথে রুমিনাকে প্রাইভেট কল করলো।

রুমিনা, নর্থে, ৪৫’-৫৬’-১২’ কোঅর্ডিনেটে খেয়াল করো।

রিশানের স্পেসস্যুট থেকে কোঅর্ডিনেট শেয়ার হয়ে গেলো রুমিনার স্যুটে।

ওহ মাই গড রিশান!

ওরা কি আনুবিসের মেম্বার? আমি এখান থেকে স্পেসস্যুটের ডিটেইল বুঝতে পারছি না।

রুমিনা আর উত্তর দেয় না। রিশান ওকে ডাকে, কিন্তু কোন সাড়া নেই। নিশ্চয়ই একটু আগে রিশান ওকে যে প্যারা দিয়েছে, তার বদলা দিচ্ছে।

রিশান রনকে ডাক দিল। রন বলে উঠলো, আমি গর্তের সামনে বস। এখনই দড়ি ফেলছি।

পিঠের ব্যথা নিয়ে খুব কষ্ট হল রিশানের ওপরে উঠতে। রন সাহায্য করল হাত বাড়িয়ে। এদিকে রুমিনারা সবাই খাদের একদম কিনারে শুয়ে আছে, যাতে ওদের দেখা না যায়। রিশান আর রন ক্রল করে আস্তে আস্তে গেল সেখানে। রুমিনা রিশানকে চুপ থাকতে বলল। রিশান বুঝে গেছে এতক্ষণে যে এরা রিপাবলিকান সৈন্য। তিনজন মনে হয়েছিল, কিন্তু আসলে চারজনের একটা ছোট ইউনিট, টহল দিতে বের হয়েছে।

রুমিনার স্যুটের শক্তিশালী এন্টেনা দিয়ে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করল। ফিজ ব্যস্ত ওদের ট্রান্সমিশন জ্যাম করার জন্যে, যাতে বেইজে আর কথা না বলতে পারে।

রিপাবলিকান সৈন্যদের এটা রুটিন টহল। হালকা কথাবার্তা বলতে বলতে তারা এগোচ্ছিল। সময় কাটানোর জন্যে আর কিই বা করবে। তাদের কোন ধারণাই নেই সামনে কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে।

রুমিনা একদৃষ্টিতে ফিজের দিকে তাকিয়ে আছে। ফিজ কমিউনিকেশন জ্যাম করার জন্যে প্যারামিটার সেট করছে।

হঠাৎ সৈন্যদের কাছে মেসেজ আসল।

স্কোয়াড নং ১১, রিপোর্ট প্লিজ। গতকাল থেকে আমাদের র‍্যাডার কাজ করছে না এই বা*র ঝড়ের জন্যে। আমাদের এই মাত্র সতর্ক করা হয়েছে হেডকোয়ার্টার থেকে, এই গোপন বেইজের ড্যাটা লিক হয়েছে গতকাল।

তাহলে আজকে জানালো কেন হেডকোয়ার্টার? শালারা কি সারাদিন ঘুমায় নাকি?

স্কোয়াড ১১ এর দলপতি মিরান একটা বাজে খিস্তি করল। তার খুব ঘুম পেয়েছে, এই টহলটা যে কখন শেষ হবে?

ঝড়ের কারণে আমরা ট্রান্সমিশন পাইনি, তাই একটা ছোট মেসেঞ্জার রকেট পাঠিয়েছে ত্রিনিত্রি গ্রহপুঞ্জ থেকে।

আচ্ছা, কিন্তু আমরা এখনো তেমন কিছু দেখিনি। প্রোটন সবসময় যেমন থাকে তেমনই আছে। বসবাসের অযোগ্য একটা ডাস্টবিন।

ওফ হো মিরান, কাজ করো তো। কিছু দেখলে রিপোর্ট করবে সাথে সাথে। ওকে?

এত কঠিন কাজ? আরেকবার বলো তো, বুঝি নাই।

ফাজলেমি কমাও মিরান। ডু ইউর ডিওটি। ওভার এন্ড আউট।

কলটা কাটার সাথে সাথেই একটা তীক্ষ্ণ শব্দের আক্রমণে স্কোয়াডের চারজনেই কান চেপে বসে পড়ে মাটিতে। পরপর তিনটি ব্লাস্টারের চার্জ আঘাত করে মিরান ছাড়া আর তিনজনকে। বেশ শব্দ করে ঝলসে ওঠে তাদের স্পেসস্যুট, তিনজনই ঢলে পড়ে মৃত্যুর বুকে। বেইজে কল দেয়ার চেষ্টা মিরান, করে কোন লাভ হচ্ছে না।  

শিবরাম তাকায় রুমিনার দিকে, ওকে কি রাখব? ইনফো দিতে পারবে?

কোন দরকার নেই।

রুমিনার ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর আসে।

আরেকবার আলোর ঝলকানি, মিরানও এবার শুয়ে পড়ে মাটিতে।

চলো, এখখুনি আনুবিসে যেতে হবে! লেটস রান!

সবার মাঝে এখন অন্যরকম একটা স্পৃহা চলে এসেছে। যুদ্ধকে যতই ঘৃণা করুক তারা, যুদ্ধই এখন মিশে গেছে তাদের রক্তে। যুদ্ধই এখন তাদের নেশা। ওরা কারো স্বামী ছিল, কারো সন্তান ছিলো, কারো ভাই, বোন, বা প্রেমিক, প্রেমিকা। কিন্তু এখন সেই সব পরিচয় বিলুপ্ত, এখন ওদের সবচাইতে বড় পরিচয়ঃ ওরা মহাকাশযোদ্ধা।  

রিশান দৌড়তে দৌড়তেই প্রশ্ন করে রুমিনাকেঃ

আচ্ছা, ওই অব্জেক্টটা কি ছিল? যেটা খাদের কিনারে রাখা ছিলো?

ও ব্যাটারি চার্জারটার কথা বলছো? পুরনো টেকনোলজি দিয়ে বানানো, ঝড়ের সময় খুব ফাস্ট চার্জ করে। এই যে দেখ, রুমিনা ওর পিঠের ব্যাগের দিকে ইশারা করে।

সব ব্যাটারি ফুল চার্জড।

কিন্তু ওটা নিতে হবে না সাথে?

ওটা অলরেডি বেইজে চলে গেছে, সেলফ ড্রিভেন ইউনিট, মাটির ভেতরে ঢুকে তারপর যায়, যাতে উপর থেকে কেউ না বোঝে।

তাহলে তুমি সাথে আসলা কেন? শিবরাম মাঝখান থেকে প্রশ্ন করে।

চার্জ দেয়ার সময় তো পাশে থাকটে হবে, বেকুব কোথাকার! এটা তো আর মাটির নিচে থেকেই চার্জ হয় না। চার্জ হবার সময় যদি কেউ দেখে ফেলে?

০.৫g তে দৌড়ে মজা আছে। রিদমটা ঠিক হতেই সবাই খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে।

কিন্তু রুমিনা, ডেডবডি গুলি যদি কেউ দেখে ফেলে?

আহহা, আগে আনুবিসে চলো। দ্য ওরাকল ওয়ান্টস টু সি ইউ।

ওর‍্যাকল! স্কোয়াডের সবাই খাবি খায়। রিবেল আর্মির ওর‍্যাকল আনুবিসে!!

রিশান ভেবে পায় না, তার সাথে আবার ওর‍্যাকলের কি কাহিনী?

সবার দৌড়ানোর গতি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

 

Featured Image Design Credit:

Masroor Saadeed

Bangla Science Fiction Cover Designer Masroor Saadeed

I love to sing, design stuff and play fifa all day everyday. Alt rock, punk rock fanatic, love to binge watch series and movies too.

Comments

comments